
বাংলাদেশে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে জুলাই ও আগস্ট মাস ছিল সংক্রমণ ও মৃত্যুর শীর্ষ সময়, এখন সেই জায়গা দখল করছে অক্টোবর ও নভেম্বর। গত চার বছর ধরে এমন প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নভেম্বর এখন ডেঙ্গুর সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাসে পরিণত হয়েছে।
চলতি নভেম্বরের প্রথম সাত দিনেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৯ জন—যা এ বছরের অন্য যেকোনো মাসের প্রথম সপ্তাহের তুলনায় সর্বোচ্চ। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৬৫২ জন রোগী।
অক্টোবরে একই সময় আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪ হাজার ৬২ জন। শুধু ৫ নভেম্বরেই ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে—এটি এক দিনে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সর্বোচ্চ রেকর্ড।
দেশে বড় পরিসরে ডেঙ্গু সংক্রমণ শুরু হয় ২০০০ সালে। তখন বর্ষাকাল—বিশেষ করে আগস্ট—ছিল ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যুর সময়। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে চিত্রটা উল্টে যাচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের কেইল ইউনিভার্সিটির মশাবাহিত রোগ গবেষক ড. নাজমুল হায়দার জানাচ্ছেন—
২০২১ সালের পর থেকে গড়ে:
অক্টোবরে রোগী ৩৫,৭৭৫ জন,
সেপ্টেম্বরে ৩৫,১২৫ জন,
নভেম্বরে ২৯,৯৯০ জন,
আগস্টে ২৩,০০০ জন।
২০২১ সালের আগে আগস্টে গড়ে রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৩,৪০০ জন।
২০০০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আগস্টেই সর্বোচ্চ মৃত্যু ঘটত—গড়ে ৮.৮ জন। কিন্তু ২০২১ সালের পর থেকে পরিস্থিতি উল্টে গেছে।
নাজমুল হায়দারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী,
নভেম্বরে গড় মৃত্যু ১৮৬.৬ জন,
অক্টোবরে ১৬৪ জন,
সেপ্টেম্বরে ১৪৬ জন,
আগস্টে ১০৪.৭ জন।
তিনি বলেন,
“অক্টোবর মাসে রোগী শনাক্ত বেশি হয়, আর নভেম্বর মাসে মৃত্যু বেশি ঘটে। এই পরিবর্তন বোঝা ও মোকাবিলা করার জন্য আমরা কি প্রস্তুত?”
জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজির আহমেদ বলেন,
“ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর সময় এখন বদলে গেছে। তাই মোকাবিলার কৌশলও বদলাতে হবে। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে সেই উদ্যোগ নেই।”
তিনি আরও বলেন,
“বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু চিকিৎসার প্রস্তুতি বাড়াতে হবে। এখন ডেঙ্গু আমাদের সারা বছরের রোগ।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সদ্য বিদায়ী পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশীদ বলেন,
“ডেঙ্গুর বিস্তার আসলে মশার বিস্তার। স্থানীয় সরকার যেভাবে মশকনিধন করছে, তা বদলাতে হবে।”
আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন,
“বর্তমান ওষুধে পরিবর্তন আনা দরকার। বিটিআই ব্যাকটেরিয়া বা ‘উলবেকিয়া মশা’ ব্যবহার করে ডেঙ্গু দমন করা যেতে পারে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু এখন কেবল বর্ষার রোগ নয়—এটি হয়ে উঠেছে বছরজুড়ে হুমকি। তাই রোগ মোকাবিলায় শুধু মশা নিধন নয়, গবেষণা, চিকিৎসা ও জনসচেতনতা—সব দিকেই পরিবর্তন আনতে হবে।